প্যালেস্টাইন-ইসরাইল: ইতিহাসের অন্য পৃষ্ঠা

 ভূমিকা ইতিহাস মানে শুধুই ঘটনার তালিকা নয়। ইতিহাসের পাঠ মানে একটি দৃষ্টিভঙ্গির অনুশীলন—যেখানে পাঠকের চোখ সেদিকেই যায়, যেদিকে ইতিহাসবেত্তা আলোকপাত করেন। অথচ প্রকৃত ইতিহাসের অনেক দিকই প্রচলিত পাঠচক্রের বাইরে থেকে যায়। প্যালেস্টাইন-ইসরাইল সংঘাত এমনই এক অধ্যায়, যার ব্যাখ্যায় আধুনিক পশ্চিমা মিডিয়া ও ইতিহাসের আলো যতটা পড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি আলোচনার দাবি রাখে প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদ, ধর্মীয় সহাবস্থান ও রাজনৈতিক জটিলতার গভীর স্তরগুলো। এই প্রবন্ধে আমরা চেষ্টা করব সেই ইতিহাসকে নতুন করে, প্রচলিত বয়ান ছাপিয়ে বিশ্লেষণ করতে।

১. প্যালেস্টাইন: প্রাচীন ইতিহাস ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্যালেস্টাইনের ভূখণ্ড ইতিহাসে নানা জাতি ও ধর্মের আগমন ও বিতাড়নের কেন্দ্রস্থল। খ্রিস্টপূর্ব ৭২২ সালে নিও-আসিরীয় সাম্রাজ্যের সম্রাট প্রথম জেরুজালেম অধিকার করেন এবং স্থানীয় ইহুদিদের বিতাড়িত করেন। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ সালে পারস্যের কিং সাইরাস দ্য গ্রেট জেরুজালেম অধিকার করে ইহুদিদের পুনর্বাসিত করেন। কুরআনে বর্ণিত জুলকারনাইনের সাথে তাঁর পরিচয় নিয়ে অনেক ইসলামিক ইতিহাসবিদ মত প্রকাশ করেছেন।

এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৬৪ সালে রোমানরা জেরুজালেম দখল করে। সেই সময় থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডে কোনো ইহুদি রাষ্ট্র ছিল না। ইহুদিদের শাসনকাল, যদি কখনো থাকে, তাও সাময়িক এবং খণ্ডিত—একশ বছর পেরোনো কোনো শাসন নয়। বরং এই দীর্ঘ সময়ে ইহুদিরা বরাবরই নানা দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে।

২. মুসলিম বিজয় ও ধর্মীয় সহাবস্থান: ৬৩৫-১৯১৭ ৬৩৫/৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে খলিফা ওমর (রা.)-এর নেতৃত্বে জেরুজালেম মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর শুরু হয় মুসলিম শাসনের দীর্ঘ ধারা—যেখানে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি সবাই একটি নির্দিষ্ট সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সহাবস্থান করত।

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ১১৮৭ সালে ক্রুসেডারদের কাছ থেকে জেরুজালেম পুনর্দখল করেন এবং পুনরায় সহনশীল শাসনব্যবস্থা চালু করেন। তারপরে ওসমানি শাসন (১৫১৭–১৯১৭) পর্যন্ত ইহুদিরা মুসলিমদের রাজত্বে নিরাপদেই ছিল। বরং তখন ইউরোপের নানা খ্রিস্টান রাজ্যে তারা নিপীড়িত হচ্ছিল এবং আশ্রয় নিচ্ছিল মুসলিম সাম্রাজ্যে।

৩. ইউরোপীয় নিগ্রহ ও জায়োনিস্ট ষড়যন্ত্রের উত্থান মূলত রোমান শাসনের সময় থেকেই ইহুদিদের ওপর নিগ্রহ চলতে থাকে। রোমান সম্রাট খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর, সেটা এক পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়, যা চলে শতাব্দির পর শতাব্দি। জেরুজালেমে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ইউরোপে থাকা ইহুদিরা খ্রিস্টান শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতনের শিকার হয়েছে বহুবার। তাদের অনেককেই ওসমানি সুলতানরা আশ্রয় দিয়েছিল, দিয়েছিল বাণিজ্য করার অধিকার।

ইহুদিদের ওপর শতাব্দিব্যাপী এই নির্যাতনের ফলে ইউরোপের ক্ষুব্ধ ইহুদিদের একটি গোষ্ঠি জন্ম দেয় জায়োনিজম—একটি রাজনৈতিক আদর্শ যা ধর্মীয় ইহুদিবাদকে সরিয়ে একটি জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক রাষ্ট্রের দাবি করে। শুরু হয় ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্রের নতুন এক অধ্যায়।

১৮৯৭ সালে থিওডোর হার্জলের নেতৃত্বে প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেস বসে, যেখানে "ইহুদিদের জন্য নিজস্ব রাষ্ট্র" প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। এই রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যস্থল হিসেবে ধরা হয় প্যালেস্টাইন।

৪. বিশ্বযুদ্ধ, বেলফোর ঘোষণা ও ব্রিটিশ খেলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ওসমানিদের পতন হয় এবং ব্রিটিশরা প্যালেস্টাইন দখল করে নেয়। ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর এক ঘোষণায় প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের সমর্থন জানায়—এটি ছিল ঐতিহাসিক বেলফোর ঘোষণা।

এই ঘোষণার পেছনে ছিল ব্রিটেনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ: সুয়েজ খাল, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদ এবং প্রাচ্য রাজনীতিতে নিজেদের স্থায়ী আধিপত্য রক্ষা। সেইসাথে জায়োনিস্ট ধনকুবেরদের সমর্থন পেতে চায় ব্রিটিশরা।

৫. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম (১৯৪৮) হিটলারের নাজি শাসনে ছয় মিলিয়ন ইহুদি হত্যার পর বিশ্ব সহানুভূতির ঢেউ উঠলে, জায়োনিস্ট নেতারা তা কাজে লাগান। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু সেই রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়—এই ঘটনাই ‘আল-নাকবা’ নামে পরিচিত।

৬. আধুনিক ভূরাজনীতি, মার্কিন সমর্থন ও ইসলামী বিশ্বের বিপর্যয় ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য ভেঙে দেয় এই জোট। একদিকে মার্কিন অস্ত্র ও পুঁজির জোরে ইসরায়েল শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে আরব বিশ্ব ভাগ হয়ে পড়ে।

আরব-ইসরায়েল যুদ্ধগুলোতে (১৯৪৮, ১৯৬৭, ১৯৭৩) ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তির সমর্থনে বারবার বিজয়ী হয় এবং ফিলিস্তিনি জনগণ হারায় তাদের জমি, অধিকার ও স্বাধীনতা।

৭. কুরআনিক পরিপ্রেক্ষিত ও ইহুদি বর্ণনায় ইতিহাস ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ও কুরআনে বর্ণিত ঘটনাগুলোতে প্যালেস্টাইনের গুরুত্ব ও ইহুদিদের ধ্বংসের কারণগুলি উঠে আসে। ইসলামে ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষ নয়, বরং সতর্কতা ও ইতিহাসচেতনার আহ্বান রয়েছে।

৮. ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন: হামাস, ফাতাহ ও বিভাজন ফিলিস্তিনে প্রতিরোধ রাজনীতির দুটি প্রধান ধারার উদ্ভব হয়: ধর্মভিত্তিক হামাস ও ধর্মনিরপেক্ষ ফাতাহ। ফাতাহের নেতৃত্বে পিএলও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নেয়, আর হামাস সামরিক প্রতিরোধের পথে হাঁটে। এই বিভাজন ফিলিস্তিনিদের ঐক্যে দুর্বলতা সৃষ্টি করে।

৯. তেল, ধর্ম ও ভূরাজনীতি: সৌদি, ইরান ও তুরস্কের ভূমিকা সৌদি আরব একদিকে পশ্চিমা জোটের অংশ, অন্যদিকে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে। ইরান শিয়া আদর্শে হামাস ও ইসলামিক জিহাদকে সহায়তা করে। তুরস্ক ওসমানি ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের কৌশলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সোচ্চার।

উপসংহার প্যালেস্টাইন-ইসরাইল সংঘাত শুধু ধর্মীয় দ্বন্দ্ব নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের ফলাফল। মুসলিম শাসনে যেখানে সহাবস্থান ছিল, সেখানে পশ্চিমা জায়োনিস্ট ও খ্রিস্টান শক্তির যুগপৎ আগ্রাসনে আজকের এই সংকট। ইতিহাসকে নতুন করে পড়া ও বুঝে তা সমসাময়িক রাজনীতিতে প্রয়োগ করাই আমাদের করণীয়।

✍️ মিলন সৈয়দ
সম্পাদক, অকালবোধন

জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রক ও পশ্চিম প্রাচীর: প্যালেস্টাইন ও ইসরাইল সংঘাতের ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থল


Comments

Most Read

Unraveling the Threads of the Student Movement: A Reflection on Farhad Mazhar's Insights

Tomiris: The Warrior Queen

Bangladesh and Awami League: An Inseparable Reality

Echoes of August 21