বাংলাদেশের দরজায় ভূরাজনৈতিক ফাঁদ!

রাখাইন করিডোর, যা জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রদানের একটি কৌশলিক পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা বাস্তবে একটি গভীরতর ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই করিডোর শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটি গঠনের ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় এই পদক্ষেপের সাথে ২০১৪ সালের ইউক্রেনের মাইদান ম্যাসাকার এবং ২০২৪ সালের জুলাই ম্যাসাকার-এর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়—যার পেছনে মার্কিন ডিপ স্টেটের উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।


১. করিডোরের মুখোশ ও প্রকৃত রূপ

করিডোরটি জাতিসংঘের ব্যানারে পরিচালিত হলেও এটি হবে একটি আংশিক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যেখানে পশ্চিমা জোট (বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামরিক, কনসাল্টিং ও গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে তুলবে। রাখাইন করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হবে:

  • রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে দীর্ঘস্থায়ী পশ্চিমা উপস্থিতি স্থাপন

  • ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) প্রতিদ্বন্দ্বী কাঠামো গঠন

  • দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-নাটো স্টাইল ঘাঁটি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি

  • রাখাইন অঞ্চলে গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স ও সিগন্যাল মনিটরিং এর হাব গড়ে তোলা


২. ভারত, চীন ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া: বন্ধুত্ব না প্রতিরোধ?

চীন ও ভারতের জন্য এই করিডোর একটি নিরব বোমা

  • চীন এই অঞ্চলে কাইউকফিউ বন্দর ও গ্যাস-পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। রাখাইন করিডোর সরাসরি সেই পরিকাঠামো হুমকির মুখে ফেলবে।

  • ভারতের কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্প ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নিরাপত্তা এই করিডোরের কারণে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এই হুমকি মোকাবেলায় রাশিয়ার কৌশলগত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চীন ও ভারত উভয়েই রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া মধ্যস্থতা করে চীন-ভারত অক্ষ গঠন করতে পারে, যা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে:

  • অর্থনৈতিক অবরোধ

  • রাজনৈতিক চাপে ফেলা

  • এমনকি সীমান্তমুখী সামরিক মহড়া বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

২.১: রাশিয়া-ভারত-চীন ঐক্যের জিওপলিটিক ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ

  • বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে সম্মিলিত শুল্ক/নন-টারিফ বাধা

  • বন্দর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

  • দক্ষিণ চট্টগ্রাম উপকূলে স্পাই ও ড্রোন ওয়ারফেয়ার বেড়ে যাওয়া

  • বেইজিং-দিল্লি মস্কোর একটি সম্ভাব্য সিক্রেট ফোরাম গঠিত হতে পারে যেখানে বাংলাদেশের ভবিষ্যত ভূখণ্ডগত গতিপথ নির্ধারণের চেষ্টাও হতে পারে।


৩. ইউনূস্কি সরকার ও ইউক্রেনের ছায়া

২০১৪ সালে ইউক্রেনের মাইদান বিপ্লবের পর একটি মার্কিন-পন্থী পুতুল সরকার গঠিত হয়, যার ফলাফল ছিল রাশিয়ার সাথে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ম্যাসাকার—যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশকে নিষ্ক্রিয় করে ছাত্র-জনতা আড়ালে বিদেশি সহায়তায় শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়—এই ঘটনার সাথে অস্বাভাবিক সাদৃশ্য বহন করে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার বাস্তবে একটি পশ্চিমা প্রক্সি প্রশাসন, যার মূল এজেন্ডা:

  • বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে পশ্চিমা সেনা ঘাঁটি ও ডেটা সেন্টার স্থাপন

  • ভারত-চীন উভয়পক্ষকে দুর্বল করে একটি ইন্দো-প্যাসিফিক ফ্রন্টিয়ার তৈরি

  • দেশীয় রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের সীমিত ব্যবহারে পশ্চিমা ‘কন্টেইনমেন্ট কৌশল’ প্রয়োগ


৪. বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী শক্তির দ্বৈত চরিত্র

বিএনপি এই মুহূর্তে করিডোর ইস্যুতে একটি কৌশলগত নীরবতা পালন করছে। তবে ইতিহাসে তাদের:

  • ২০০১-২০০৬ মেয়াদে পশ্চিমা তোষণমূলক পররাষ্ট্রনীতি

  • একাধিক প্রভাবশালী এনজিও ও কূটনীতিকদের সাথে গোপন বৈঠক

এই সবের আলোকে মনে করা যায়, তারা হয়তো ভবিষ্যতে করিডোর ইস্যুতে অননুষ্ঠানিক সমর্থন দিতে পারে। একইসাথে, বিএনপির ভেতরে দুটি লবি ক্রিয়াশীল:

  • এক, জাতীয় স্বার্থপন্থী—যারা করিডোরের বিরুদ্ধে

  • দুই, ক্ষমতালাভকামী—যারা পশ্চিমাদের সমর্থন ধরে রাখতে চায়

৪.১: অন্যান্য দলগুলোর অবস্থান

  • বাম গণতান্ত্রিক জোটের কিছু অংশ একবার বিরোধিতা করলেও, জাতিসংঘ ও মানবিকতা ব্যবহারে তারা চুপসে যেতে পারে

  • জামায়াত ও ইসলামপন্থী দলগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় আপাতত নীরব, তবে জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টকে উস্কে দিতে পারে


৫. আওয়ামী লীগ ও সেন্টমার্টিন ইস্যু: প্রেক্ষাপটের গূঢ়তা

শেখ হাসিনার শাসনকালে যুক্তরাষ্ট্র বহুবার সেন্টমার্টিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। তিনি প্রতিবারই তা নাকচ করেন। এর ফলে মার্কিন ডিপ স্টেট ও এনজিও নেটওয়ার্ক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ২০২4 সালে ডিজাইনড ম্যাসাকার ও তথাকথিত জনতার অভ্যুত্থানের মূল উৎস ছিল এই ‘নির্বাক প্রতিশোধ’।

বর্তমানে করিডোর চালুর মাধ্যমে সেই ঘাঁটি কৌশলে বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থক বলয় এই ষড়যন্ত্র উন্মোচনে সোচ্চার:

  • তারা করিডোর ইস্যুকে সরাসরি ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি’ বলছে

  • আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও থিঙ্কট্যাংককে ব্যবহার করে লবিং শুরু হয়েছে

  • শেখ হাসিনা হয়ত ভবিষ্যতে প্রবাস থেকেই ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্টারমুভমেন্ট শুরু করবেন


উপসংহার: বাংলাদেশ কোন পথে?

রাখাইন করিডোর বাংলাদেশের জন্য একটি ভূখণ্ডগত ও কৌশলগত ঝুঁকিপূর্ণ উন্মুক্ত দরজা। পশ্চিমাদের দেওয়া ‘মানবিকতা’ ও ‘সাহায্য’র মুখোশের আড়ালে এখানে স্পষ্টভাবে:

  • একটি পশ্চিমা সামরিক ও গোয়েন্দা কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা

  • ভারত-চীন উভয়ের বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ তৈরি

  • রাশিয়ার মধ্যস্থতাকেও উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে ‘প্রক্সি জোন’ বানানোর দুঃসাহস

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রয়োজন সর্বাধিক। এখন সময়:

  • বুদ্ধিবৃত্তিক, কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে করিডোর বিরোধিতার

  • তথ্য-ভিত্তিক জনমত গঠনের

  • বাংলাদেশকে ‘নতুন ইউক্রেন’ বানানোর অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার

নচেৎ, বাংলাদেশের জন্য আসন্ন দিনগুলো হতে পারে ভূরাজনৈতিক ব্যূহের এক ভয়াবহ ফাঁদ, যার পরিণতি দীর্ঘমেয়াদি ও অনুশোচনামূলক।

Milon Syed 
Editor of AkaalBodhon 

বাংলাদেশ-রাখাইন করিডোরের মানচিত্র, যেখানে আন্তর্জাতিক সামরিক ঘাঁটি ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব চিহ্নিত; চীন, ভারত ও পশ্চিমা প্রতীকের ছায়াপাত।





Comments

Most Read

Unraveling the Threads of the Student Movement: A Reflection on Farhad Mazhar's Insights

Tomiris: The Warrior Queen

Bangladesh and Awami League: An Inseparable Reality

Echoes of August 21