পাকিস্তান: একটি ধারণাগত রাষ্ট্র এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা

পাকিস্তান রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, গঠন ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে গেলে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—পাকিস্তান কি আদতে একটি "রাষ্ট্র", নাকি এটি একটি ধারণা বা কল্পনালব্ধ গঠন, যার ভিত্তি রাজনীতি, ধর্মীয় ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সমীকরণের উপর দাঁড়িয়ে? এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম, জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়।

রাষ্ট্র ও দেশের মধ্যে পার্থক্য

রাজনীতিবিজ্ঞানের পরিভাষায় "রাষ্ট্র" (State) এবং "দেশ" (Country) দুটি ভিন্ন ধারণা। রাষ্ট্র বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন, যা চারটি মৌলিক উপাদানে গঠিত—জনগণ, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌম ক্ষমতা। অন্যদিকে, "দেশ" শব্দটি অধিকতর সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক ধারণা, যেখানে একটি ভূখণ্ড, জনগোষ্ঠী ও তাদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা প্রাধান্য পায়।

উদাহরণস্বরূপ, ফিলিস্তিন একটি দেশ হিসেবে স্বীকৃত হলেও এখনো রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত নয় জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্যের কাছে। আবার কুর্দিস্তান একটি জাতিগত-সাংস্কৃতিক দেশ হলেও এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এটি একটি রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও, এর অস্তিত্ব অনেকাংশে কল্পনালব্ধ রাজনৈতিক ও সামরিক অভিপ্রায়ের উপর দাঁড়িয়ে।

পাকিস্তানের জন্ম: একটি ধারণার বাস্তবায়ন

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হয় দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। এই তত্ত্বে বলা হয়, মুসলমান ও হিন্দু দুটি আলাদা জাতি, এবং তারা একত্রে সহাবস্থান করতে অক্ষম। এই ধারণা রাজনৈতিকভাবে ব্রিটিশদের মদদে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই তত্ত্বের বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করে ইতিহাস নিজেই—কারণ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মই প্রমাণ করে, ধর্মীয় ভিত্তির উপর রাষ্ট্র গঠন একটি অস্থিতিশীল ও অবাস্তব ধারণা।

বঙ্গবন্ধু ও জনগণের নেতৃত্ব

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রকৃত অর্থে জনগণের নেতা হিসেবে যিনি আত্মপ্রকাশ করেছেন, তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন একমাত্র নেতা যিনি গণভোটে জনগণের সরাসরি ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন। তার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সামিল হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

বর্তমান পাকিস্তানের প্রেক্ষিতে যদি কাউকে জনগণের নেতা বলা হয়, তবে ইমরান খানকে সেই জায়গায় রাখা যেতে পারে, যদিও তার জনপ্রিয়তা অনেকাংশে একটি কর্পোরেট-মিডিয়া নির্মিত ভাবমূর্তি। তা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ডিপ স্টেট যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে তিনি আইএসআই ও সেনাবাহিনির পছন্দের নেতা নন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ডিপ স্টেট

পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হলো সেনাবাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে একটি তথাকথিত "ডিপ স্টেট" বা গভীর রাষ্ট্র, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এরা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং দেশটির পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এমনকি মিডিয়া ও বিচার ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করে।

পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বা বেনজির ভুট্টোসহ বহু জনপ্রিয় নেতা এই ডিপ স্টেটের রোষানলে পড়েছেন। সেনাবাহিনী বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে, যেমন ১৯৯৯ সালে পারভেজ মোশাররফ কর্তৃক নওয়াজ শরীফের সরকার উৎখাত। উল্লেখযোগ্য যে, মোশাররফ কারগিল যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন মূলত সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে, এবং এর মাধ্যমে সেনাবাহিনির গুরুত্ব বাড়ানোই ছিল অন্যতম লক্ষ্য।

ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধ ও যুদ্ধাবস্থা: সেনাবাহিনির কৌশল

পাকিস্তান সেনাবাহিনির কৌশলগত একটি পন্থা হলো, সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সেনাবাহিনির অবস্থান সুদৃঢ় করা। ১৯৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯ সালের যুদ্ধসমূহ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিশেষ করে কারগিল যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণরূপে সেনাবাহিনির পরিকল্পিত, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্মতি পর্যন্ত ছিল না।

সাম্প্রতিক কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলাও এমন একটি ঘটনার অংশ, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেনাবাহিনির কর্তৃত্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই হামলার মাধ্যমে একদিকে ভারতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যস্ত রাখা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সেনাবাহিনিকে 'রক্ষাকর্তা' হিসেবে উপস্থাপন করাই ছিল লক্ষ্য।

বাংলাদেশে আইএসআই-এর ভূমিকা ও মুহাম্মদ ইউনূস ইস্যু

৫ আগস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আইএসআইয়ের কর্মতৎপরতা দৃশ্যত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত-শিবির ও পাকিস্তানপন্থী চক্রের  রাজনৈতিক পুনরুত্থান এই বিষয়ের সত্যতা প্রকাশ করে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান দখলদার সরকারকে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন জামায়াতের ছত্রছায়ায় পরিচালিত একটি পাকিস্তানপন্থী শাসনব্যবস্থা। এই সরকার আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের 'নিরপেক্ষ' ভাবমূর্তি তৈরি করার চেষ্টা করলেও অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে জামায়াত ও আইএসআইয়ের প্রভাব স্পষ্ট।

রাজনীতির ময়দানে ভারতবিদ্বেষ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতের বিরুদ্ধে হুমকি, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্যের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ও বর্তমান সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সামাজিক মাধ্যমে একটি বিতর্কিত লেখা শেয়ার করেন, যা স্পষ্টভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব প্রতিফলিত করে।

এই সরকার ও জামায়াতের মাধ্যমে আইএসআই বাংলাদেশকে একটি কার্যকর দ্বিতীয় ঘাঁটিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে। এর উদ্দেশ্য শুধু ভারতবিরোধী মনোভাব জিইয়ে রাখা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে একটি স্ট্র্যাটেজিক ফ্রন্ট গড়ে তোলা।

উপসংহার

পাকিস্তান রাষ্ট্র একটি ক্লাসিক্যাল আধুনিক রাষ্ট্রের মতো কাজ করে না। এটি একটি ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি এমন এক রাজনৈতিক সত্তা, যার মূল চালিকা শক্তি হলো সেনাবাহিনী ও আইএসআই। জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সেখানে সীমিত এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ডিপ স্টেটের অনুমোদিত। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কেবলমাত্র একটি 'স্ট্র্যাটেজিক প্যাদার' মতো—বিশেষ করে চীন ও আমেরিকার বৈরী সমীকরণে ব্যবহৃত এক রাজনৈতিক সরঞ্জাম। ভারতের সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, এবং কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাই পাকিস্তান ডিপ স্টেটের কৌশলগত অস্ত্রভাণ্ডারের অংশ।

এই বাস্তবতা অনুধাবন করে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বলয় গঠনের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়, যেখানে বাংলাদেশ, ভারত ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তান ডিপ স্টেটের এই অস্থিতিশীল কৌশলের মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।

Milon Syed
Editor of AkaalBodhon

Pakistan, Bangladesh, India flags symbolizing South Asian geopolitics and regional tensions.



Comments

Most Read

Unraveling the Threads of the Student Movement: A Reflection on Farhad Mazhar's Insights

Tomiris: The Warrior Queen

Bangladesh and Awami League: An Inseparable Reality

Echoes of August 21