তৌহিদী জনতা: ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে ফিতনা সৃষ্টি
বাংলাদেশে "তৌহিদী জনতা" ব্যানারে নানা মিছিল-মিটিং সংঘটিত হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সাধারণ ধর্মভীরু মুসলিমদের কাছে এটি একটি পরিচিত শব্দ হলেও, এর প্রকৃত অর্থ ও ব্যবহার নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে "তৌহিদী জনতা" শব্দের প্রকৃত ব্যাখ্যা কী? এটি কি কেবল ধর্মীয় অর্থ বহন করে, নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়? এ প্রবন্ধে আমরা এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করব।
তাওহিদের মূল বার্তা ও সংজ্ঞা:
তাওহিদ (توحيد) ইসলামের কেন্দ্রীয় বিশ্বাস, যার অর্থ "একত্ববাদ" বা "এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস।" কুরআন ও হাদিসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
তাওহিদের তিনটি স্তর:
১. তাওহিদ আর-রুবুবিয়্যাহ (توحيد الربوبية) – আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রক। 2. তাওহিদ আল-উলুহিয়্যাহ (توحيد الألوهية) – শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং অন্য কাউকে উপাস্য না মানা। 3. তাওহিদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত (توحيد الأسماء والصفات) – আল্লাহর নাম ও গুণাবলি কেবল তাঁরই জন্য নির্ধারিত।
তাওহিদের এই তিনটি স্তর মানার মাধ্যমেই একজন মুসলিম প্রকৃত মুয়াহহিদ (একত্ববাদী) হতে পারে।
"তৌহিদী জনতা" শব্দের বিশুদ্ধতা:
তাওহিদ বলতে বোঝায় আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী হওয়া, কিন্তু "তৌহিদী জনতা" শব্দটি বাংলাদেশে প্রায়শই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
সমস্যা কোথায়?:
তাওহিদের প্রকৃত অনুসারী হওয়া মানেই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শে থাকা নয়।
"তৌহিদী জনতা" শব্দটি ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য প্রয়োগ করা হয়।
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা এবং শিরক থেকে দূরে থাকা, যা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
ফিতনার ভয়াবহতা
ইসলামে ফিতনা (فساد বা فتنة) খুবই গর্হিত ও নিন্দিত একটি বিষয়। কুরআন ও হাদিসে ফিতনা সৃষ্টিকারীদের কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
ফিতনা সম্পর্কে কুরআনের বাণী
ফিতনা হত্যা থেকেও ভয়ংকর – “ফিতনা হত্যা অপেক্ষা কঠিন।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৯১)
ফিতনা সৃষ্টিকারীদের কঠোর শাস্তি – “যারা ঈমান আনার পর কুফর করে এবং ফিতনা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।” (সূরা আন-নাহল ১৬:৮৮)
ভূমিতে ফিতনা ছড়ানো নিষিদ্ধ – “যখন তাদের বলা হয়, ‘ভূমিতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করো না,’ তারা বলে, ‘আমরা তো সংশোধনকারী মাত্র।’ জানিয়ে দাও, তারাই আসলে অনিষ্টকারী, কিন্তু তারা তা বুঝে না।” (সূরা আল-বাকারা ২:১১-১২)
ফিতনা সম্পর্কিত হাদিস
ফিতনার সময় ঘরে থাকা উত্তম – রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “একসময় ফিতনা সৃষ্টি হবে, তখন বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে, আর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি চলমান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে।” (বুখারি, হাদিস: ৩৬০১; মুসলিম, হাদিস: ২৮৮৭)
ফিতনা সৃষ্টি করা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য – “মুনাফিকদের চিহ্ন হলো তারা ফিতনা সৃষ্টি করবে, মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ আনবে।” (তিরমিজি, হাদিস: ২২৬১)
উপসংহার
বাংলাদেশে ধর্মের নামে রাজনীতি করা দল ও গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করে তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’ নামে ফিতনা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। এই কর্মকাণ্ড ইসলামি শিক্ষা ও কুরআনের নির্দেশনার পরিপন্থী। আমাদের উচিত, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, যাতে কোনো গোষ্ঠী ধর্মের নামে আমাদের বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে না পারে।

Comments
Post a Comment